Thursday, October 10, 2019

পারসোনাল রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট— কী? কেনো? এবং কীভাবে?


জীবনে উন্নতি করার জন্য ও যথাসময়ে লাইফের বিষয়সমূহ অ্যাচিভ করার জন্য Personal Resource Assessment তথা, ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জন খুবই প্রয়োজন। প্রবাদে আছে— 'গ্রন্থগত বিদ্যা আর পরহস্তে ধন, নহে বিদ্যা নহে ধন হলে প্রয়োজন'। এমনকি সেটা নিজের বাপের ধনসম্পদ হলেও সেটা কোনো কাজে আসে না। তাই অল্প বয়স থেকেই পড়াশুনার পাশাপাশি পারসোনাল রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট শুরু করে দাও। আর পারসোনাল রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট কারা করবে ও কীভাবে করবে সে বিষয়ে এই নিবন্ধে বিস্তারিত বলা হয়েছে।

পারসোনাল রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট বিষয়ে বলতে গেলে প্রথমে বলতে হয় কারা পারসোনাল রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট করবেন?
হ্যা, এর উত্তর হলো— যারা কনজারভেটিভ ফ্যামিলির সন্তান শুধু তারাই পারসোনাল রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট করবেন। যারা ডেডিকেটেড ফ্যামিলির সন্তান তাদের পারসোনাল রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট করার প্রয়োজন হয় না; ফ্যামিলির সম্পদ ও সাপোর্টই তাদের লাইফে সহায়ক হয়। যাহোক মূল কথায় আসি। বিসিএস আইডল 'সুশান্ত পাল' তার ফেসবুকে একদিন একটি অনুচ্ছেদ লিখেছিলেন, সেটি হলো→
৩ ধরনের লোকের সাথে সম্পর্ক রাখা কঠিন—
এক) যাদের মধ্যে কৃতজ্ঞতাবোধ নেই, যারা জীবনকে বিচার করে জীবনে ওরা কী পায়নি, কেবল তা দিয়ে। Gratitude is power.
দুই) যারা সারাক্ষণই তাদের নিজের জীবন এবং আশেপাশের সবকিছু নিয়ে অভিযোগ করতে থাকে। অতি প্রত্যাশা মানুষকে অসুস্থ, ক্রুদ্ধ ও অবিবেচক করে দেয়। You love someone and 'so' you overexpect from them. It really destroys their life. Better, even hate them and let them live in peace.
তিন) যারা মনে করে, একমাত্র তারাই ঠিক, বাকিরা সবাই ভুল। তারা কখনও নিজেকে শোধরানোর চেষ্টা করে না, কারণ তারা বিশ্বাসই করে না যে তাদের মধ্যে এমন কিছু আছে, যা শোধরানো প্রয়োজন। It's a serious mental disorder!
এমন মানুষ আপনাকে মানসিকভাবে হত্যা করতে থাকে প্রতিটি মুহূর্তেই। The tragedy is, not always you can get rid of them.

সুতরাং তোমাদের যাদের অভিবাবক এরূপ ধরণের তারা লাইফে পারসোনাল রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট করবে। আর শুধু তারাই নয়, যাদের অভিবাবক এই তিন ধরণের তারা তো লাইফে পারসোনাল রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট করবেই সেইসঙ্গে আরও কিছু ধরণের ব্যক্তিত্ব আছে যাদের অভিভাবক সেরূপ ব্যক্তিত্বের লোক তারাও লাইফে পারসোনাল রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট করবেন। সেসব হলো—

১. No Risk ও কমফোর্ট জোনে থাকা সুবিধা প্রত্যাশী: এ ধরণের ব্যক্তি এরূপ যে, তারা ভাবে নিজের সম্পদ যদি অধিক মাত্রায় ব্যয় করে সন্তানের লাইফ উন্নত করে দেই, আর সন্তান যদি বৃদ্ধ বয়সে না দেখে তথা অবহেলা করে তাহলে তো লস্। এই ঝুঁকি কেনো নিবো? অন্যদিকে আবার তাদের সন্তান লাইফে ভালো কিছু করে তাদের মুখ উজ্জ্বল করুক ও তাদের বৃদ্ধকালের সাপোর্ট হোক এই প্রত্যাশাও করে। অর্থাৎ ঝুঁকিমুক্ত কমফোর্ট জোনে থাকবে আবার সম্মান ও সুবিধাও প্রত্যাশা করবে— 'গাছ রোপণ করবে কিন্তু গাছের পরিচর্যা করবে না আবার সেই গাছ হতে যারা গাছের পরিচর্যা করে যেরূপ ফল পায় সেইরূপ ফলও আশা করবে'। এরূপ অভিভাবক যাদের রয়েছে তারা লাইফে পারসোনাল রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট করবে।

২. আদর্শহীন যুক্তিবাদী অর্থাৎ যুক্তি দেখিয়ে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া ব্যক্তি: এ ধরণের ব্যক্তি হলো 'দুষ্ট সিংহ ও মেস সাবকের গল্পে'র সিংহের চরিত্রের মতো। গল্পটা হলো— একদিন এক মেস সাবক পাহাড়ের ঝর্ণায় পানি খেতে গেলো। আর তাকে দেখে এক সিংহের খুব লোভ হলো, এবং  ভাবলো এতো সুন্দর ও তাজা মেস সাবককে খেতেই হবে। তো সিংহ যে মেস সাবকটিকে খাবে এটাতে সে নিজেকে লোভী ও নিষ্ঠুর হিসেবে প্রমাণ করতে রাজি নয়, তাই সে নিজেকে সাধু প্রমাণ করে ভেড়ার বাচ্চাটিকে খেতে একটি অজুহাত তথা খোঁড়াযুক্তি উপস্থাপন করলো; সে মেস সাবকটিকে বললো, 'এই বদমাশ, তুই জল ঘোলা করলি কেনো? আমি পশুরাজ হয়ে তোর ঘোলা করা জল পান করবো?'। মেস সাবক উত্তর দিলো, 'হুজুর আপনি তো উপরে (উজানে) আছেন আর আমি নিচে (ভাটিতে) আছি, জল আপনার কাছে থেকে নিচে নেমে আমার কাছে আসছে, আমি জল ঘোলা করলেও সেটা তো অন্যদিকে যাচ্ছে, আপনার কাছে তো যাচ্ছে না; তাহলে আমার ঘোলা করা জল পান করতে আপনার সমস্যা হচ্ছে- এটা কেমন কথা?'। তখন সিংহ বলল, "আচ্ছা, এটা কথা বাদ; একবছর আগে তুই আমার নামে কটু কথা বলে আমাকে গালাগালি করেছিলি এজন্য তোকে শাস্তি পেতে হবে"। মেস সাবক উত্তর দিলো, "হুজুর আমার বয়স ছয়মাস মাত্র, একবছর আগে আমি আপনাকে গালি দিয়েছি আবার কীভাবে?"। এবার সিংহ বলল, "ও, তাহলে তোর মা আমাকে গালি দিয়েছিল; তুই তো দেখতে তোর মায়ের মতো তাই চিনতে ভুল হচ্ছে, যাহোক তোর মায়ের জন্য তোকে শাস্তি পেতে হবে"— এই বলে সিংহ মেস সাবককে তাড়া করে ধরল ও খেয়ে ফেলল।
এ ধরণের ব্যক্তিও হলো, তারা কোনো একটি দায়িত্ব পালন করবে না, তবে এটি তাদের দায়িত্বহীনতা কিংবা ব্যর্থতা হিসেবে প্রকাশ পাক তাও তারা হতে দেবে না, তারা বরং একটা খোঁড়াযুক্তি দেখিয়ে দায়িত্ব এড়িয়ে যাবে। যেমন ধরো— তুমি একটা প্রয়োজনীয় জিনিস চেয়েছো। তখন তাদের কোনো একটা খোঁড়া যুক্তি দাঁড় হবেই। যেমন- "অমুকের সম্পদ তো আমার চেয়ে বেশি, সে কি তার সন্তানকে এই জিনিস দিয়েছে? তাহলে আমি কেনো দিবো?"
এদের মেন্টালিটি হলো- একটি যুক্তি দেখানো ও সেই যুক্তির সাথে একটি উদাহরণ জুড়ে দেওয়া ও এভাবে নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া ও নিজেকে সাধু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রাখা। তোমাদের যাদের অভিভাবক এই ধরণের তাদেরকে লাইফে পারসোনাল রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট করতেই হবে।
কারণ, চিকিৎসা বিজ্ঞানে দেখা যায় এমন কিছু কিছু রোগ আছে সেসব রোগ যার থাকে সেই রোগের সাথে সম্পর্কিত আরও কিছু রোগ তার থাকে তেমনি এ ধরণের লোক খুবই স্বার্থবাদী হয় এবং এটা সাইকোলজিক্যালি প্রমাণিত যে, এ ধরণের লোকের মতিগতি খুবই অভাবনীয়, অকল্পনীয় ও অস্বাভাবিক হয়ে থাকে। যেমন- হয়তো দেখা গেলো তুমি সারাজীবন ফ্যামিলিতে কাজ করে আশায় থাকলে আর শেষ বয়সে মৃত্যুর পূর্বে তিনি সন্তানের লাইফের কথা না ভেবে নিজের নামধাম ফুটানোর জন্য কিংবা 'সাদকায়ে জারিয়া' অর্জনের জন্য তিনি তার সমস্ত সম্পত্তি কোনো এক দাতব্য সংস্থায় উইল করে দিলেন। তাই এ ধরণের লোকের উপর কোনোরূপ ভরসা করবে না। এক্ষেত্রে পারসোনাল রিসোর্স অ্যাসেসমেন্টই তোমার একমাত্র পন্থা।

৩. মামলাবাজ: একজন নেশাখোর তিনদিন অভুক্ত থাকার পর তাকে যদি অল্প কিছু টাকা দেওয়া হয় তবে সেই টাকা দিয়ে সে প্রথমে খাবার কেনার পরিবর্তে নেশার বস্তু কিনবে কিংবা নেশার বস্তু কেনার টাকাটা আগে আলাদা করে রেখে দেবে, বাকি টাকা দিয়ে অল্প কিছু খাবার কিনবে; খাবার তার কাছে সেকেন্ড বিষয়। নেশা না ছাড়া পর্যন্ত সে স্বাভাবিক মানুষ হতে পারবে না। ঠিক একই অবস্থা মামলাবাজ মানুষদের ক্ষেত্রেও। একবার 'প্রথম আলো' পত্রিকায় পড়েছিলাম, এমনকি তাদের ছবিসহ ছাপিয়েছিল- দক্ষিণবঙ্গের কোন জেলায় যেনো দুইজন ব্যক্তি কয়েক শতক জমির একটি টিলা নিয়ে আদালতে মামলায় রত। তারা সেই কয়েকশতক জমির জন্য একযুগ ধরে মামলা চালাচ্ছেন এবং মামলা চালাতে গিয়ে নিজেদের কয়েক বিঘা জমি পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছেন। তবুও তারা একে অন্যের কাছে হারতে নারাজ। এই ধরণের ইগোসম্পন্ন অস্বাভাবিক মেন্টালিটির মামলাবাজ অভিভাবক যার রয়েছে সে অবশ্যই লাইফে পারসোনাল রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট করবে। কারণ এরূপ অভিভাবক ফ্যামিলিতে থাকলে ফ্যামিলির উন্নতির জন্য যতো কিছুই করো না কেনো সব বিফলে যাবে।

৪. উদাসীন-দায়িত্বহীন অভিভাবক: এই পয়েন্টটি লেখার প্রয়োজন হয় না; কারণ যারা বাস্তবতা দেখে বড় হয় তারা ছোটবেলা থেকে সেভাবেই গড়ে উঠে। তারপরও এটি লিখছি শুধু বাস্তবতা দেখে বড় হওয়া ও মরীচিকা দেখে বড় হওয়া এর মধ্যে পার্থক্য অনুধাবন করানোর জন্য। আমার পরিচিত একজন লোক ছিলেন। উনার কোনো ছেলেসন্তান না থাকায় ও পরপর কয়েকটি মেয়েসন্তান হওয়ায় এবং আবারও বিয়ে করার পর সেখানেও মেয়েসন্তান হতে থাকায় উনি সংসারের প্রতি উদাসীন হয়ে পড়েন। তার মেয়েসন্তানগুলোর কাছে তাদের মা'ই ছিল প্রধান অবলম্বন। কারণ তিনি তার সন্তানদের লাইফ নিয়ে ভাবতেন না। তিনি উদাসীন ছিলেন, ঘুরে বেড়াতেন ও অপরিণামদর্শী ছিলেন। মাঝে মাঝে জমি বিক্রি করে সংসারের ও নিজের ঘাটতি মেটাতেন ও নিজের নেশায় মত্ত থাকতেন। তার নেশা ছিল বিভিন্ন পুরাতন ও প্রাচীন আমলের পয়সা সংগ্রহের কাজে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ানো এবং তার স্বপ্ন ছিল একদিন তিনি এতো দামী পয়সা পাবেন যে তা জায়গামতো বিক্রি করে তিনি কোটিপতি হবে। তার স্বপ্ন পূরণ হয়নি; তিনি বেঁচেও নেই। এই কথাগুলো উনাকে ছোট করার উদ্দেশ্যে লিখছি না, উনার আত্মার শান্তি কামনা করেই লিখছি। যাহোক, আমি এখনে যে বিষয়টা তুলে ধরতে চাই সেই আসল কথায় আসি। যেহেতু তার সন্তানরা এই বাস্তবতা দেখেই বড় হচ্ছিলেন যে, তাদের বাবা তাদের লাইফ নিয়ে ভাবেন না। তাই তারা নিজেদের পথ নিজেরা তৈরি করতে কাজ করা শুরু করেন। দুইবোন গার্মেন্টসে কাজ করতেন তাদের একজন সেই চাকরির মাঝেই এসে কারিগরি বোর্ড হতে এইচএসসি পরীক্ষা দেন ও পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চাঞ্চ পেয়ে টিউশনি করে পড়াশুনা চালান। এখন বিয়ে হয়েছে। বরসহ দুজনেরই টিউশনি করে চলেন ও সরকারি চাকরির চেষ্টা করছেন, বিভিন্ন চাকরি হয়েছিল কিন্তু করেন নাই, সরকারি চাকরির জন্য নিজেদের সর্বোচ্চ ইফোর্ট দিচ্ছেন। আরেক বোন জাতীয়তে পড়তেন ও চাকরি করে বেশ টাকা জমিয়েছেন, এখন সেই টাকা বিনিয়োগ করেছেন একটি সহজ ব্যবসায় আর সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের বড় দুইবোন প্রথমে বিভিন্ন প্রজেক্টে ও কোম্পানিতে চাকরি করতেন, তাদের একজন এখন ব্যাংকের ক্যাশে সহকারী হিসেবে থাকেন ও তার স্বামী ভালো চাকরি করেন। সবার ছোট বোন পড়াশুনা করেন। অগ্রজদের তৈরি করা পথ ও সহযোগিতা তার জন্য সহায়ক হয়েছে। যাহোক এতক্ষণে অবশ্যই অনুধাবন করতে পেরেছো যে, যারা বাস্তবতা দেখে বড় হয় তাদের সমস্যা হয় না। সমস্যা হয় তাদের যারা মরীচিকা দেখে বড় হয়। কারণ একটা কথা আছে "গাছে তুলে দিয়ে মই টান দেওয়া" এটা তাদের সাথে ঘটে থাকে। তারা ভুল বিশ্বাস নিয়ে জীবন চালায় এবং ভুলটা এমন এক সময়ে এসে ধরা পড়ে ততদিনে তার অনেককিছু হারানো হয়ে যায়। আবার শুরু থেকে শুরু করতে হয়। লাইফের কাজগুলো পিছিয়ে যায়।

৫. ধোঁকাবাজ ধূর্ত অভিভাবক যার আছে : এমন কিছু অভিভাবক থাকেন যারা আসলে তার সন্তানকে কোনো একটা জিনিস দিবেন না, কিন্তু সেই বিষয়টা আবার ডাইরেক্ট বলবেও না যে তারা সেটা দিবে না; বরং সেটা দেওয়ার নাম করে তা না দেওয়ার নাটক তৈরি করবে। এই পদ্ধতিটা এরূপ, সন্তান কোনো একটা বড় জিনিস চেয়েছে সেটা সে মেনে নেওয়ার অভিনয় করে সেটা দেওয়ার কথা বলে একটা লোকদেখানো আয়োজন করবে যেমন গরু বিক্রি কিংবা গাছ বিক্রি কিংবা জমি বন্ধক ইত্যাদি এরূপ কিছুর জন্য লোক ডাকাডাকি শুরু করবে (আসলে এসব বিক্রি বা কোনোটাই করবে না, শুধু দেখানোর জন্য এসব আরকি) এবং একই সঙ্গে সেই সন্তানের সঙ্গে প্রতি মূহুর্তে অহেতুক রাগারাগি ও দুর্ব্যবহার করবে; বলতে গলে অযৌক্তিক কারণেই দুর্ব্যবহার করতে থাকবে। এতে সেই অভিভাবক টার্গেট নিয়েই মাঠে নামে যে সন্তান যাতে তার সেসব অযৌক্তিক দুর্ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে তার সাথে উল্টো দুর্ব্যবহার করে। সন্তান যে পর্যন্ত না এই কাজ করে সে পর্যন্ত সে তার দুর্ব্যবহারের মাত্রা বাড়াতে থাকে। সহ্যসীমা অতিক্রম করলে সন্তান যখন উল্টো দুর্ব্যবহার করে তখন সুযোগ পেয়ে বলে বসে, "তুই আমাকে এসব বলিস! আর তোর জন্য আমি গরু/ গাছ বিক্রি বা জমি বন্ধক ইত্যাদি এসব করছি, আমি কী ভুল করতেছি রে! যা তোকে ভুলেও এসব দিবো না, তোর মতো সন্তানের জন্য টাকা খরচ করা বড় ভুল হবে আমার"। এভাবে সে দেওয়ার নাটক করে আর দিবে না।
এরূপ অভিভাবক যার আছে তার জীবনে পারসোনাল রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট এর কোনো বিকল্প নেই।

এছাড়াও, যারা ফ্যামিলির আনপ্রডাকটিভ সন্তান তারা লাইফে পারসোনাল রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট করবে। একটি ভাঙা হৃদয়, একটি ক্ষুধার্ত পেট ও একটি শূন্য পকেট যে শিক্ষা দেয় পৃথিবীর কোনো স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান সেই শিক্ষা দিতে পারে না। পুস্তকে লেখা থাকে "আইন সবার জন্য সমান"; কিন্তু বাস্তবে আইন সবার জন্য সমান নয়, বাস্তবে সবাই আইনের সুবিধা সমান তথা ন্যায্যভাবে ভোগ করতে পারে না। তেমনি পুস্তকের শিক্ষা হলো বাবা-মা সব সন্তানের জন্য সমান, কিন্তু বাস্তবতা হলো বাবা-মা ও সব সন্তানের জন্য সমান নয়। তারাও হিসাব নিকাশ করে কাজ করেন। যে সন্তান ভাগ্যবান এবং মেধাবী অর্থাৎ প্রডাক্টিভ, কাজে সফল হন বাবা-মা তার পিছে বেশি সম্পদ ব্যয় করেন আর যে সন্তান ভাগ্যবান নন, মেধাবী নন তথা সফল নন তার পিছে ব্যয় করাটা অনর্থক মনে করেন। বিষয়টা তেলে মাথায় তেল দেওয়া— এর মতো। অথচ যে সন্তান ভাগ্যবান নয় তার দিকে একটু সহানুভূতির নজর দিয়ে তাকেও কিছুটা সাহায্য করে তার লাইফের ঘাটতিটা পুশিয়ে দেওয়া হবে এই কাল্পনিক প্রত্যাশা অনেক সন্তানই করে থাকেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই কাল্পনিক বিশ্বাস পুরাই ভুল; সাহায্য তো দূরে থাক কোনো ব্যক্তির কাছে নিজের কষ্টের গল্প করতে গেলে প্রথম দুইদিন সে সেই গল্প শুনে সহানুভূতি দেখিয়ে স্বান্তনা দেবে, তৃতীয় দিন সে কষ্টের গল্প শুনতে বিরক্ত হয়ে যাবে এবং বলবে, 'দূরো, তোর এতো কিছু হয় কেনো হে? চুপ কর এসব আর শুনতে ইচ্ছে করছে না'।
তাই তুমি আনপ্রডাকটিভ সন্তান হয়ে থাকলে ছোটোবেলা থেকেই পারসোনাল রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট শুরু করা উচিৎ, কারণ হাতে কিছু সম্পদ থাকলে কিছু করার সুযোগ থাকে। শূন্য থেকে কোনো কিছুই হয় না, দই তৈরি করতে গেলেও কিছু পুরাতন দই লাগে। তাই এরূপ হতভাগা সন্তানরা এখন থেকেই পারসোনাল রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট শুরু করে দাও।


এখন বলতে হয় পারসোনাল রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট কীভাবে করবে সেই  বিষয়ে। পারসোনাল রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট কতভাবে করা যায়?
হ্যা, পারসোনাল রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট দুইভাবে করা যায়, যথা— এক) ডাইরেক্ট আয় হয় এরূপ কাজ এবং দুই) নিজের দক্ষতা উন্নয়ন যা কাজে লাগিয়ে অর্থ উপার্জন করা যায়।

১) ডাইরেক্ট আয় হয় এরূপ কাজ: এরূপ কাজের শুরুটা হয় গিফট থেকে। তোমার যদি দাদা-দাদি, নানা-নানী থাকে এবং তারা কিপটে না হয়ে থাকে আর অংশীদারীত্বের সমস্যাটা সহজ হয় তবে উনাদের সাথে ভালো সম্পর্ক তৈরি করে দুই আড়াই শতক জমি গিফট হিসেবে লিখে নিতে পারো, সেখানে একটা ভালো কাঠের গাছ লাগিয়ে দাও যেনো তোমার ২৪-২৭ বছর বয়সে সেটা ২০/২৫ হাজার টাকা বিক্রি করতে পারো। কিংবা তাদেরকে বুঝিয়েও জমি নেয়া ছাড়াও সেটা করতে পরো; এতে লস নাই তো। গাছে তো খাবার দিতে হয় না; সেটা তুমি নিজে বিক্রি করে টাকা নিতে না পারলেও লস নাই, আর পেলে সেটা গিফট।
এছাড়াও অল্প বয়সে ছোটো আকারে পশুপাখি পালন শুরু করতে পারো। একইভাবে দাদ-দাদী/ নানা-নানী'দের কাছে থেকে ছাগল বা বাছুর গরু নিতে পরো। পাখি পালন আরও সহজ, অল্প ব্যয়ে শুরু করা যায়। তবে পাখি পালন বিষয়ে একটি কথা রিমার্ক করে বলতে হয় তা হলো- কেউ যদি কবুতর পালন করতে চাও তাহলে প্রথমে ছোট আকারে শুরু করবে ও কমদামী জাতের কবুতর দিয়ে শুরু করবে। আর সর্বোচ্চ যত্ন পরিচর্যা করার পরেও যদি প্রথমবারেই কবুতর না টিকে তথা একে একে সবগুলো মরে যায় তাহলে আর দ্বিতীয়বার এই পাখি পালনের চেষ্টা করো না। কারণ কবুতর পালন জিনিসটা সবার হয় না, সবার ভাগ্য কবুতর পালন জিনিসটা সুইট করে না— এই কথাটা শুনে হয়তো কুসংস্কার মনে হতে পারে, কিন্তু ঘটনা সত্য। আমি দুইবার কবুতর পালনের চেষ্টা করেও পারি নাই। সর্বোচ্চ যত্ন, সচেতনতা ও পরিচর্যা করেও কবুতর টিকে নাই।

২) নিজের দক্ষতা উন্নয়ন: একটা প্রবাদ আছে 'কর্মদক্ষতাই গরীবের সর্বাপেক্ষা বড় বন্ধু'; বিভিন্ন দক্ষতা অর্জন করে থাকলে তা কাজে লাগিয়ে তুমি প্রয়োজনের সময় যেমন অর্থ উপার্জন করতে পারবে তেমনি তা করে আয় করে পারসোনাল রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট হিসেবে অর্থ সঞ্চয়ও করতে পারবে। এরূপ কিছু দক্ষতা হলো—
ক. পড়ানোর দক্ষতা: এই কাজে দক্ষ হতে হলে তোমাকে ভালো ছাত্র হতে হবে ও কোনোকিছু অন্যকে বুঝানোর দক্ষতা অর্জন করতে হবে। তাহলে তুমি তোমার নিচের ক্লাসের শিক্ষার্থীদের পড়িয়ে অর্থ উপার্জন করতে পারবে।
খ. কম্পিউটার দক্ষতা: কম্পিউটারের কাজে দক্ষ হলে তুমি বিভিন্ন কম্পিউটার ভিত্তিক কাজ পাবে। পারসোনাল রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট এর জন্য কম্পিউটারের কোন কোন কাজ শিখবে তা পূর্বের অধ্যায়ে বলেছি।
গ. মার্কেটিং দক্ষতা: তুমি যদি পরিশ্রমী ও স্মার্ট হতে পারো তাহলে বিভিন্ন প্রজেক্ট ও ইভেন্টের মার্কেটিং করে অর্থ উপার্জন ও সঞ্চয় করতে পারবে।
ঘ. কমিউনিকেশন দক্ষতা: এটি বর্তমান সময়ের সবচেয়ে দামী একটি দক্ষতা। দুঃসময়ে প্রস্তুতির জন্য পারসোনাল রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট এর জন্য হোক আর লাইফে বড় কিছু করতে চাইলেই হোক, তোমাকে কমিউনিকেশন দক্ষতা অর্জন করতেই হবে। আর এই কাজে দক্ষ হলে তুমি নিজেই কাজ খুঁজে পাবে বা নিজেই উদ্যোক্তা হবে, আমাকে আর কিছুই বলতে হবে না।
তবে এসব দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি কিছু সময় বিভিন্ন ওডজব করে টাকা জমাতে হবে। কারণ প্রায় প্রত্যেকের লাইফেই একটি ক্লাইম্যাক্স সংকট সময় থাকে, আর সংকটের দিনে নিজের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে অর্থ উপার্জন করতে গেলেও কিছু টাকা লাগবে। কোথাও গিয়ে তো সেখানে সেসব কাজ করতে হবে; এতে প্রাথমিক থাকা খাওয়ার জন্য কিছু টাকা লাগবে যেটা ওডজব করে সঞ্চয় করে রাখতে হবে।

এছাড়াও, তুমি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়ে থাকলে পড়াশুনার পাশাপাশি চাকরি করে পারসোনাল রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট করতে পারো। এটা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ভালো সুযোগ।

* অ্যাসেসমেন্ট (Assessment) অর্থ মূল্যায়ন; কিন্তু আমি এখানে অ্যাসেসমেন্ট শব্দটি 'অর্জন' অর্থে কেনো ব্যবহার করেছি তার পেছনে ব্যাখ্যা আছে। Achievement অর্থ বড় কোনো অর্জন, যেমন- গোল্ড মেডেল পাওয়া, পুরস্কার পাওয়া ইত্যাদি। অন্যদিকে দুঃসময়ের জন্য সঞ্চয় এটাও অর্জন তবে এই জিনিসটা বিশ্ববিদ্যালয়ের কন্টিনিউয়াস অ্যাসেসমেন্ট এর মতো; কন্টিনিউয়াস অ্যাসেসমেন্ট এর ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিতে এর অর্থ মূল্যায়ন আর শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত দিক থেকে এটি তার অর্জন বা সঞ্চয়। তাই এই নিবন্ধে অর্জন অর্থে আমি অ্যাসেসমেন্ট শব্দটি ব্যবহার করেছি।

© লেখা: মেহেদী হাসান
বই— 'স্বপ্ন, ভালোবাসা ও বাস্তবতা' (লেখা চলছে)

Note: যারা এর আগে আমার লেখা কপি করে বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপে নিজেদের নামে চালাইছিলেন তাদেরকে বলে রাখি, তখন আমার মেজাজ ভালো ছিলো তাই কিছু করি নাই। এখন কিন্তু মেজাজ খুব খারাপ অবস্থায় আছে। তাই লেখা চোররা সাবধান।


সুন্দর জীবনের জন্য পরামর্শ | Advice Desk

No comments:

Post a Comment